সালটা ঠিক মনে নেই। অনেক বছর আগের কথা। অনলাইন ভোটিং এর মাধ্যমে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত (১২০ কিলোমিটার) কক্সবাজারকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্য (Seven Wonderers) নির্বাচনের জন্য জোর প্রচার প্রচারনা চালানো হয়েছিল। সেই সময় বুকের মধ্যে একটি অদ্ভুত স্বপ্ন বাসা বাঁধে,  যদি কোনদিন পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতটি পুরোটা পায়ে হেঁটে দেখতে পারতাম, যদি টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আমার পদচিহ্ন এঁকে যেতে পারতাম !

ভ্রমণ যখন নেশায় পরিণত হলো তখন থেকেই একটি দল খুঁজছিলাম যাদের সাথে পুরো সমুদ্র সৈকত, টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হেঁটে পাড়ি দিয়ে আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। ২০১৭ সালে সোহান ভাইয়ের আয়োজনে স্বপ্নটা যেন সত্যি হতে চলছিলো। কিন্তু ভাগ্য খারাপ থাকলে যা হয় ২০১৭, ২০১৮ সালে মোট তিন বার উদ্যোগ নিয়েও বিভিন্ন কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশেষে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ৪ দিনে পুরো সমুদ্র সৈকত হাইকিং করতে সক্ষম হই। আজ আপনাদের সেই স্বপ্ন ভ্রমনের গল্পই বলবো ।

সায়দাবাদ থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ এর বাসে আমরা ১২ জন রওনা দেই টেকনাফের উদ্দেশ্যে। বাস আমাদের খুব ভোরে টেকনাফ নামিয়ে দেয়। ট্যুরের আয়োজক সোহান ভাই টেকনাফে রাত্রিযাপন করায় খুব ভোরেই আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে চলে আসেন। আমাদের এই বীচ হাইকিং ট্যুরের মোট সদস্য সংখ্যা ২৫ জন। সবাই এখনো এসে পৌঁছায়নি। চিটাগাং, কক্সবাজার সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা আসছে, তাই হাইকিং শুরু করতে একটু দেরি হবে। এই সুযোগে আমরা টেকনাফের মাথিনের কুপ, নাফ নদীতে নির্মিত নতুন জেটি, জিরো পয়েন্ট ঘুরে দেখি।

সকাল ১০ টা। কুয়াশা কেটে আকাশে ঝলমলে রোদ উঠে গেল। একের পর এক সাগরের নীল জলরাশি আছড়ে পড়ছে পায়ের গোঁড়ায়। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি টেকনাফ সমুদ্র সৈকতে। গ্রুপ ছবি তোলা শেষে সবাই হাঁটা শুরু করলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ইনশাল্লাহ হেঁটে যাব পুরো সমুদ্র সৈকত।

প্রশ্ন আসতে পারে কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দিকে না হেঁটে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার এর দিকে কেন হাইকিং শুরু করলাম? এর কারণ ছিলো যদি আমরা টেকনাফ থেকে হাইকিং শুরু করি তবে সূর্য সব সময় আমাদের পেছনে থাকবে তাই সূর্যের আলো সরাসরি আমাদের চোখে পড়বে না এতে আমাদের হাঁটা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

ছোট একটা ব্যাগে টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন পাওয়ার ব্যাংক, গামছা, শুকনো খাবার, পানি রেখে আমাদের সাথে থাকা তাবু, বড় ব্যাগ প্রতিদিন হাইকিং শুরুতেই গাড়িতে করে রাতের ক্যাম্প সাইটে পাঠিয়ে দেই। এতে আমাদের হাইকিং অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

দুপুরে যেহেতু আমরা হাইকিং এ থাকতাম তাই প্রতিদিন দুপুরের খাবার হিসেবে ছিল কলা, বিস্কুট, কেক আর খেজুর। আর রাতে জম্পেশ খাবারের আয়োজন থাকতো।

আকাশে সূর্য ঝলমল করছে। কিন্তু আমাদের মাঝে কোন ক্লান্তি নেই কারণ সাগরের উপর থেকে বয়ে আসছে শীতল বাতাস। একপাশে সুনীল সাগর আরেক পাশে সুউচ্চ পাহাড়। এমনি মনভোলানো দৃশ্য অবলোকন করতে করতে আমরা হেঁটে যাচ্ছি স্বপ্ন যাত্রার পথে। প্রথম দিন আমরা হাঁটি মাত্র ১৫ কিঃলোঃ পথ। যেতে হবে বহুদূর।

প্রথম রাতে আমরা ক্যাম্প করি কচ্ছপীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। বিদ্যালয়টির সামনে মেরিন ড্রাইভ আর পেছনে সুউচ্চ পাহাড়। পাশেই রয়েছে একটি মসজিদ। এখানে মূল সৈকতটি একেবারে মেরিন ড্রাইভ লাগোয়া। মসজিদের ইমাম সাহেব খুব অমায়িক মানুষ, ডাব দিয়ে তার আতিথেয়তা কোন দিন ভুলবো না। স্থানীয় এক বাড়িতে রাতের ও সকালের খাবারের আয়োজন করি।

রাত প্রায় ১০ টা। দাঁড়িয়ে আছি সমুদ্র সৈকতে। পেছনে একটু দূরে উঁচু পাহাড়। নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি পাহাড়ের চূড়ার দিকে। চূড়াটা পুরোপুরি “V” আকৃতির মাঝখানটা খালি দুপাশে উঁচু। পাহাড়ের আড়াল থেকে ঠিক “V” আকৃতির পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে বিশালাকার ঝলমলে মায়াবী চাঁদ দৃশ্যমান হচ্ছে। সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে এমন বিরল দৃশ্য দেখার জন্য হয়তো হাজার বছর অপেক্ষা করা যায়।

সকাল প্রায় ৯.৩০। কচ্ছপীয়া থেকে দ্বিতীয় দিনের হাইকিং শুরু করি। আজকে আমাদের হাঁটতে হবে ২৫ কিঃমিঃ এর বেশি। আজ রাতে আমরা ক্যাম্প করবো শামলাপুর নামক এক জায়গায়। হেঁটে যাচ্ছি সমুদ্র সৈকত ধরে আর আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে একপাশে সুনীল সাগর আরেক পাশে সুউচ্চ পাহাড়। মাঝে মাঝে মাতাল হাওয়ায় ঝাউবন গুলো দুলছে।

আমার ধারণা ছিল একমাত্র সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও ইনানি বীচে কিছু প্রবাল দেখা যায়। কিন্তু ভুলটা ভাঙ্গলো দ্বিতীয় দিন হাইকিং এ, কয়েক কিলো বীচ জুড়ে চোখে পড়েছে প্রচুর প্রবাল আর স্বচ্ছ নীল জল। যেখানে আকাশ আর সাগরের রঙ মিলে একাকার। জোয়ারের জলে সৌন্দর্য টা বেড়ে গিয়েছিলো কয়েক গুন। যেনো আটকা পড়ে গিয়ে ছিলাম সেন্টমার্টিনের ঐ মায়াজালে। এই বীচেই চোখে পড়লো ছোট ছোট বিভিন্ন রংয়ের প্রচুর ঝিনুক যেন কেউ স্তুপ করে রেখেছে।

বিকাল প্রায় ৪.৩০, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে। আমাদের গন্তব্য শামলাপুর। ইতিমধ্যে ২৫ কিঃমিঃ এর বেশি পথ হেঁটে ফেলেছি কিন্তু শামলাপুরের দেখা নেই। পা যেন আর চলছে না। হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমরা শামলাপুর ২.৫০ কিলো পেছনে ফেলে চলে এসেছি। মুহূর্তের মধ্যে রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করলো শরীরে। পেছনে ফিরতে হবে আরো ২.৫০ কিঃমিঃ। এ যেন সামনে আরো ১০ কিঃলোঃ হাঁটার চাইতেও অনেক বেশি কঠিন।

পশ্চিম আকাশে সূর্যের অনেক তাড়া, তাকে ডুব দিতে হবে বিশাল সাগরে বুকে, তাই আমাদেরও দ্রুত তাবু টানাতে হবে। আজ রাতে আমরা ক্যাম্প করেছি শামলাপুর। একেবারে বীচের পাশে ঝাউবনের নিচে। শামলাপুর ক্যাম্পিং করার জন্য আদর্শ স্থান। আমাদের ক্যাম্প সাইটের পাশেই সমুদ্র সৈকত ঘেঁষে রয়েছে একটি মসজিদ। মসজিদের রয়েছে দুটি টিউবওয়েল ও বেশ কয়েকটি বাথরুম। এতে আমাদের বেশ সুবিধা হয়। মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। শামলাপুর বাজারে আমরা রাতের খাবার সম্পন্ন করি।

রাত ৯ টা। বসে আছি সৈকতে । উপরে ঝলমল করছে চাঁদ। জ্যোৎস্নাময়ী সাগরের গর্জন আর সৈকতের বালুর উপর সারি ধরে রাখা সাম্পান গুলোতে বিভিন্ন রঙের বাতির টিপ টিপ আলোয় কেমন যেন চোখ ধাঁদিয়ে উঠছে। যা আমাকে তাবুতে যেতে দিচ্ছে না। যদিও কাল ঘুম থেকে উঠতে হবে আনেক ভোরে কারণ কাল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ৩০ কিলোমিটারের বেশি পথ।

ভোরে ঘুম ভাঙ্গে সৈকতে জেলে মাঝিদের হাঁক ডাকে। একে একে নীল সাগর থেকে মাছ বোঝাই করে সাম্পান গুলো পাড়ে ভিড়ছে আর জেলে পাইকাররা ব্যস্ত মাছ নিলামে। এমনি সময় সকাল ৭ টা। শামলাপুরকে বিদায় জানিয়ে আমরা তৃতীয় দিনের হাইকিং শুরু করি। নির্জন বীচ, মাইলের পর মাইল হেঁটে যাচ্ছি কোন পদচিহ্ন নেই। মাঝে মাঝে চোখে পড়লো দুই এক জন জেলে ও কিশোর যারা ব্যস্ত চিংড়ির ডিম সংগ্রহে। তৃতীয় দিন আমারা অতিক্রম করি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ইনানি সমুদ্র সৈকত। ইনানি খাল পার হওয়ার জন্য আমাদের মেরিন ড্রাইভে উঠতে হয়েছিলো। খালের সেতু পার হয়ে আমরা আবার নেমে যাই সমুদ্র সৈকতে। আজ রাতে আমরা ক্যাম্পেইন করবো সোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে।

বিকাল ৪ টা, আমরা চলে এসেছি সোনাপাড়া, হেঁটেছি ৩০ কিলোমিটারেও অনেক বেশি পথ। মেরিন ড্রাইভ থেকে অনেক খানি দূরে সোনাপাড়া গ্রামের ভিতরে সোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান।বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবনের নিচ তলায় খালি যায়গায় তাবু টানাই। বিদ্যালয়ের কাছেই বাজার। সেখানে আমরা রাতের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করি। আর বিদ্যালয়ের মাঠে চলে বারবিকিউ এর আয়োজন।  আজ রাতে নেই সমুদ্র সৈকত, নেই আকাশে মায়াবি চাঁদ। তাই দ্রুত ঘুমাতে যাবার কোন বাঁধা নেই। কাল পাড়ি দিতে হবে ২০ কিঃলোঃ পথ।

সকাল ৭.৩০। হাইকিং এর চতুর্থ দিন। সোনাপাড়া থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে হাঁটা শুরু করি। যেহেতু সামনে রেজু খাল পাড়ি দিতে হবে এবং খাল পাড় হওয়ার পর মেরিন ড্রাইভ থেকে সৈকতের দূরত্ব অনেক বেশি তাই প্রথম ৫ কিঃলোঃ মেরিন ড্রাইভ ধরে হাইকিং করে সৈকতে নেমে যাই। কুয়াশা নেই। ঝলমলে রোদ। বিখ্যাত হিমছড়ি সৈকতের বাকে আসতেই দৃশ্যমান হলো কক্সবাজারের আকাশচুম্বী অভিজাত হোটেল গুলো। মনে হলো এইতো চলে এসেছি কক্সবাজার। আর অল্প একটু পথ। সুগন্ধা পয়েন্ট যেন আমদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কিন্তু না মক্কা এখনো অনেক দূর। স্বপ্ন পূরণের জন্য এখনো হাঁটতে হবে অনেক পথ।

ঘড়িতে সময় ১২.৩০। মাথার উপর ঝলমলে সূর্য। এসে দাঁড়ালাম সুগন্ধা পয়েন্টে। আমাদের সবার চোখে মুখে উল্লাস, স্বপ্ন পুরনের উল্লাস, স্বপ্ন জয়ের উল্লাস, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত জয়ের উল্লাস। সুগন্ধা পয়েন্টে, সবার পরিচিত সৈকত, হাজার হাজার মানুষ। পরিচিত কক্সবাজারের অপরিচিত সৈকত হেঁটে এসে মনে হলো যেন মুক্ত খাঁচার ভেতর বন্দি কিছু মানুষ। এতো বিশাল সমুদ্র সৈকত অথচ তাদের পদচারণা অল্প একটু সৈকতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। হায় আফসোস।

আলহামদুলিল্লাহ, ৪ দিনে হেঁটে গেলাম পুরো সমুদ্র সৈকত টেকনাফ থেকে কক্সবাজার, রেখে গেলাম পদচিহ্ন। নিয়ে গেলাম এক বুক তৃপ্তি ভরা বিজয় উল্লাস। দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত জয়ের উল্লাস যা জীবনের ভ্রমণ ডায়েরীতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ।

লেখা ও ছবি: আরিফুল রাজিব,ঘুরাঘুরিই যার নেশা, বই পড়া শখ, ভালোবাসেন সাইক্লিং। স্কুল জীবন থেকেই যার ঘুরাঘুরি শুরু। কখনো সাগর, কখনো নদী, কখনো পাহাড়, কখনোবা ঐতিহ্যের খোঁজে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের ৬৪ জেলা। হেঁটেছেন পুরো সমুদ্র সৈকত— টেকনাফ থেকে কক্সবাজার। প্রতিনিয়তই দেখেন নতুন নতুন ভ্রমণ স্বপ্ন।।পড়াশোনা শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব রক্ষকের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পরেও থেমে থাকেনি তার পথ চলা।


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।