মাউন্ট ইয়ানাম, মেনতোক কাংরি, মাউন্ট চেমা, মাউন্ট কানামো, মেরা পিক ইত্যাদি তুলনামূলক সহজ এবং সাধারণত ট্রেকিং করে চূড়ায় পৌঁছুনো যায় এমন পর্বতগুলো ট্রেকারদের কাছে আজকাল বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কেমন হবে যখন আপনি এসব পর্বতের সীমা ছাড়িয়ে নাইফ রীজ, প্রচন্ড খাঁড়া সামিট রুট, কষ্টসাধ্য মোরেইন, থরে থরে জমে থাকা তুষার আর কঠিন বরফে মোড়া পথে টেকনিক্যাল গীয়ারস ব্যবহার করে কোন পর্বত শিখর জয়ের জন্য পথে নামবেন?

এই আর্টিক্যালটা তাদের জন্যই যারা ট্রেকিং পিকের সীমা ছাড়িয়ে আরো জটিল, আরো কঠিন পর্বতের জন্য নিজেকে তৈরি করছেন বা করার কথা ভাবছেন। অতএব, এক্ষুনি জেনে নিন, আপনার প্রথম টেকনিক্যাল সামিটের জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন হবে এবং কি কি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।

পথ বা রুট সম্পর্কে জানুন:

অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটির সবকিছুতেই একটা নির্দিষ্ট এবং নির্ধারিত গ্রেডিং সিস্টেম রয়েছে তেমনি ট্রেকিং বা মাউন্টেনিয়ারিংয়েও তাই। আপনি হয়ত ইতমধ্যেই অসংখ্য Class 1 এবং Class 2 গ্রেডের অসংখ্য ট্রেকিং করেছেন যা সাধারণত ক্রমানুসারে খাঁড়া পাথুরে বা জঙ্গলে ঢাকা এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ। যেখানে অসংখ্য ট্রেকারদের আনাগোনায় স্পষ্ট পথচিহ্ন রয়েছে। রয়েছে পথ নির্দেশনা বা অন্য পথ চলতি ট্রাভেলারদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ। কিন্তু যখনই আপনি এই Class 2 গ্রেডটাকে ছাড়িয়ে আরেকটু সামনে মানে Class 3 বা Class 4 গ্রেডের রুটগুলোর দিকে এগোবেন তখনই জমে উঠবে আসল খেলাটা।

গাছ আর সবুজের সীমানাকে পিছনে ফেলে বড় বড় সব বোল্ডার পেরিয়ে. ভয়ংকর ঝুড়ো পাথরে ভরা স্ক্রী (Scree), পাথুরে মোরেইন (Moraine), বরফে ঢাকা গ্লেসিয়ার(Glacier), ভয়ংকর ক্রিভাস(Crevasse) ছাড়িয়ে যতই আপনি উপরের দিকে উঠতে থাকবেন ততই পথ ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে এবং আপনার অজান্তে কিংবা আপনার প্রবল সচেতনতার মাঝেই আপনি একসময় Class 3, Class 4 এমনকি Class 5 গ্রেডের রুটে নিজেকে আবিস্কার করবেন। যেখানে ট্রেইল বা ট্রেকিং সম্পর্কে আপনার প্রাথমিক অভিজ্ঞতাগুলো নিতান্তই চুপচাপ! মাউন্টেনিয়ারিং স্কিল, শারীরিক সক্ষমতা, ব্যালেন্স, দড়ি বা রোপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, রক ক্লাইম্বিং এর বিষয়ে উপযুক্ত জ্ঞান এবং চর্চা, উচ্চতাজনিত শারীরিক অসুস্থতা এবং তা থেকে বেরুনোর উপায় এক কথায় জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই আপনার জানা থাকা বাধ্যতামূলক।

উপযুক্ত গীয়ারস বা ইক্যুয়িপমেন্ট:

টেকনিক্যাল সামিট বা টপ গ্রেডের টেকনিক্যাল রুটগুলোতে আপনার সাথে উপযুক্ত গীয়ারস বা ইক্যুয়িপমেন্ট থাকা জরুরী। পর্বতের পথে আবহাওয়া কখন কেমন হবে তা ধারণা করা আজকের এ যুগেও বেশ মুশকিল অতএব, আপনার সাথে প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় থাকতেই হবে। আপনার শরীরকে উষ্ণ রাখতে  সিনথেটিক অথবা উল দিয়ে তৈরি ইনার/বেইস লেয়ার এবং মিডলেয়ার যেমন জরুরী তেমনই প্রচন্ড ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে ডাউন জ্যাকেট বা আউটার শেলের প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম। এছাড়াও ভাল মানের ওয়র্কিং এবং ডাউন গ্লাভস, রেইনকোট বা পঞ্চ, উইন্ড ব্রেকার, সান হ্যাট ইত্যাদি আপনার ব্যাকপ্যাকে থাকতেই হবে হোক সেটা খুব উজ্জল ঝলমলে আবহাওয়ার কোন সময়।

টেকনিক্যাল সামিট বা ট্রেকিং রুটে জুতোর ভূমিকা অসীম। প্রচন্ড পিচ্চিল বা ভঙ্গুর পাথুরে পথে একজোড়া ভাল জুতো আপনার জীবন বাঁচাবে। ভাল গ্রীপ করে এমন হাই-নেক (High Neck) এবং জলরোধি (Waterproof) জুতো সবচেয়ে কার্যকরী। এছাড়াও মোরেইন বা বরফে ঢাকা পথে উন্নতমানের প্লাস্টিক বা লেদারে তৈরি স্নো বুট কিংবা মাউন্টেনিয়ারিং বুট থাকা একান্তই জরুরী। এতে আপনার পথ চলা যেমন সহজ এবং ঝুঁকিমুক্ত হবে তেমনি আপনার পা দুটোও থাকবে নিরাপদ। এক্ষেত্রে ভাইব্রাম (Vibram বা Megagrip rubber) সোলের জুতো সবচেয়ে নিরাপদ। যেকোন ভাল গীয়ার স্টোর বা গীয়ার রেন্টাল শপে এ ধরনের জুতো পেয়ে যাবেন অনায়াসে। La Sportiva, Koflach, Hoka One One Sky Arkali ইত্যাদি ব্র্যান্ডের জুতো হতে পারে আপনার নিশ্চিত পছন্দ।

জুতো এবং উষ্ণতার পরে আসি টেকনিক্যাল গীয়ারস প্রসঙ্গে। হার্নেস, ক্লাইম্বিং রোপ, পিটন বা অনুরুপ অ্যাংকরিং ডিভাইস, আইস এক্স, ক্রাম্পুন, হেলমেট, স্ক্রু-গেইট এবং প্লেইন গেইট ক্যারাবিনার, কুইক ড্র, ফিগার এইট বা এটিসি-র মত ডিসেন্ডিং ডিভাইস, স্লিং, প্যারাকর্ড ইত্যাদি প্রায় সবকিছুই আপনার অভিযান এবং পর্বতের ধরণ বুঝে সাথে রাখতেই হবে। এখানে একটা কথা না বললেই নয় তা হলো, এসব জিনিস কেনা কিংবা ভাড়া নেয়ার আগে জেনে নিন এদের ব্র্যান্ড নেইম সম্পর্কে এবং তা অবশ্যই UIAA সার্টিফাইড কিনা। ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটা গীয়ার খুব ভালভাবে দেখে নিন কোথাও কোন সমস্যা রয়েছে কিনা এবং আপনার শরীরের সাথে তা ঠিকঠাক ফিট হচ্ছে কিনা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো এসব গীয়ারস বা ইক্যুয়িপমেন্ট ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে জানুন এবং অনুশীলন করুন।

প্রস্তুত করুন নিজেকে:

নিতান্ত সাধারণ ট্রেকিং থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল সামিট সবখানেই আপনার শারীরিক এবং মানসিক যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশী। আর এক্ষেত্রে আপনার দক্ষতা বাড়াতে শরীরচর্চার বিকল্প কিছু নেই। শরীরচর্চা, খাদ্যভ্যাস, মেডিটেশন ইত্যাদি মিলিয়ে নিজেকে একটা সুন্দর নিয়মের মাঝে রাখুন। মনে রাখবেন অভিযানের পথে অসুস্থতার মাঝেও হয়ত সফলতা আসার ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু সুস্থ শরীরে কোন কিছু অর্জনের যে আনন্দ তার সাথে কোন কিছুর তুলনা চলেনা। অতএব, নিয়মিত শরীরচর্চায় মনোযোগী হোন এবং সেই সাথে আপনার হাতের কাছে যে সকল ট্রেকিং রুট রয়েছে সেখানে গিয়ে নিজেকে আরো যোগ্য আরো শক্তিশালী করার ব্যাপারে সচেষ্ট হোন।

মনে রাখা জরুরী:

পর্বতারোহণের পথে কিংবা যেকোন ট্রেকিংয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় মাথায় রেখে পথ চলা উচিত। এতে আপনার পথচলা এবং ক্লাইম্বিংয়ে ঝুঁকি তো কমবেই একই সাথে আপনার অভিযানে সফল হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

  1. Go Slow and Steady. ধীরস্থিরভাবে পথ চলুন। পর্বতের পথে তাড়াহুড়ো করা বোকামীর নামান্তর মাত্র।
  2. Get an Early Start. প্রতিদিন ভোরে খুব তাড়াতাড়ি পথচলা শুরু করুন। এতে করে খারাপ আবহাওয়া থেকে বাঁচার এবং সন্ধ্যা নামার আগেই গন্তব্যে পৌঁছুনোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
  3. ক্লাইম্বিংয়ে বড় স্টেপ নেয়ার চেষ্টা করবেন না। বড় স্টেপ আপনার পেশী আড়ষ্ট করবে এবং আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত করে তুলে আপনাকে ক্লান্ত করে তুলবে যা অভিযানে মোটেই কাম্য নয়।
  4. সামনের পাঁচ ফুট পর্যন্ত জায়গাটুকুর ব্যাপারেই সচেতন হোন। সেই সাথে আশেপাশে পাথর বা অনুরুপ কোন কিছু খসে পড়ছে কিনা তার ব্যাপারে সজাগ থাকুন।
  5. Three Points of Contact with the ground or wall. হাত –পা মিলিয়ে অন্তত তিনটা জায়গায় ধরা আছে কিনা নিশ্চিত হয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।
  6. Bring a Hydrant Body to the Mountain. অভিযানের আগে এবং অভিযান চলাকালীন পর্যাপ্ত জলপান করুন। পর্বতে ডিহাইড্রেশন আপনার মৃত্যু বয়ে আনতে পারে।
  7. পর্বতের পথে দশটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস সম্পর্কে জানুন।
  8. কারো সাহায্য নেয়াতে লজ্জার বা হারানোর কিছু নেই। অতএব, আপনার প্রথম টেকনিক্যাল সামিট সফল করতে প্রফেশনাল গাইড বা শেরপার সাহায্য নিন।

উপরোক্ত আলোচনার বাইরেও অনেক বিষয় রয়েছে যা আপনার পর্বতারোহণের পথকে অনেকটাই সহজ করে তুলতে সাহায্য করবে।  অতএব, জানার এবং শেখার কোন শেষ নেই। আর তাই পর্বতারোহণের নানাবিধ খুটিনাটি সম্পর্কে আরো জানার ব্যাপারে সচেষ্ট হোন। এক্ষেত্রে Living with Forest-এর নিয়মিত সংখ্যা Outdoor Hacks আপনার সহায়ক হতে পারে।


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।