এভারেস্ট ডে আজ। পাহাড় নাকি মানুষের মন কে বড় করে। আর তাই এই ছোট মনটা নিয়ে পাহাড়ের কাছে বার বার ছুটে যাই। জানিনা কতটা বড় হয়েছে মন, কতটুকু ধারণ করতে পেরেছি পাহাড়কে। নিজের ব্যাপারে স্পষ্ট না জানলে আমি একজনকে জানি যার পাহাড়ের সাথেই নিত্য সখ্যতা, যার মনটাও বিরাট বিশাল পাহাড়ের মতই। সেই মানুষটার গল্পই বলব আজ।

দেবু দা, পুরো নাম দেবব্রত মুখার্জি। ফেসবুকে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে একজন এভেরেস্টার থাকবে এই শখেই দেবু দা-কে ফ্রেন্ডশিপ রিকুয়েস্ট পাঠাই। একটুপরেই দাদার মেসেজ, অন্য একটা আইডির লিংক দিয়ে বললেন সেটায় অ্যাড করতে। করলাম। এরপর দাদাই শুরু করলেন কথা। উনি আমার প্রোফাইলে দেখেছেন আমি গাজীপুর থাকি , আর দাদার পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছিল গাজীপুরে, সেই নিয়ে শুরু হল কথা, এরপরে প্রায়ই এটা নানা প্রসঙ্গে নানান কথার পাহাড় জমতে শুরু করল।

দাদা এভেরেস্ট সামিট করেছেন এইটুকুই তখন কেবল আমার জানার ঝুলিতে, ধীরে ধীরে জানলাম শুধু এভারেস্ট নয়, পর্বতের পথে দেবু দার রয়েছে অসংখ্য সব এচিভমেন্ট আর হাজারো সব অবাক করা গল্প! যারা দেবু দাকে জানেন কিংবা দেবুদার কাছের মানুষ তারা হয়ত সেইসব গল্প নিয়ে অনেক কিছু লিখতে পারবেন বা লিখেন। তবে, আমি আজ সেই পথে হাটবোনা। আমি আজ লিখব অন্য এক দেবু দা-কে নিয়ে অন্য এক দেবু দা-র গল্প।

পাহাড় সম্পর্কে আমার কৌতুহলের শেষ নেই। দেবু দা-র সাথে পাহাড়ের গল্প নিয়ে মেতে থাকতে থাকতে একসময় আমার সেই যাবতীয় কৌতূহলের সহজ ঠিকানা যেন হয়ে উঠলো দেবু দা। প্রশ্ন, তথ্য, তত্ত্ব, ভাবনা যা কিছুই মাথায় আসে কিংবা যাই জানার ইচ্ছে হয় সাথে সাথে দাদাকে জানানো যেন আমার নিত্য কর্তব্য। কখনও দাদাকে দেখিনি বিরক্ত হতে কিংবা এড়িয়ে যেতে। পাহাড় প্রসঙ্গে হাজারো কৌতুহল মেটাতেই যেন দাদার আনন্দ। কোন দিন দেখিনি দাদা বিরক্ত হয়েছেন। কাজে ব্যস্ত থাকলে পরে কথা বলেছেন, কিন্তু কখনই এড়িয়ে যান নি এই বিশাল মনের পাহাড় পাগল মানুষটা।

সেবার আমি সোলো ট্রিপে ইন্ডিয়া গেছিলাম। রাজস্থানের এদিক সেদিক ঘুরে, দিল্লী- কলকাতা হয়ে দেশে ফিরে আসব। দেবু দা সেই সময় আইএম এফ এর একটা মিটিং এ দিল্লী ছিলেন, কিন্তু দেখা করার মতো সময় বা সুযোগ কোনটাই দুইজনের কেউই বের করতে পারছিলাম না। তাই দাদা তখন বললেন তুই এক কাজ কর্, কলকাতা নেমেই আমার বাসায় চলে আয়, তোর তো ভোরে ফ্লাইট, তোকে একটা ট্যাক্সি করে দিব, সোজা এয়ারপোর্ট চলে যাবি।

আমার রাজী না হবার কোন কারণই ছিল না। ওই ট্রিপে আমার শেষ গন্তব্য বানারসিতে দুই দিন ঘুরে রাত ১০ টায় ট্রেন ধরতে চলে গেলাম মুঘলসরাই স্টেশনে। ভারত বা বাংলাদেশের মাঝে আর কিছু মিল থাকুক আর না থাকুক ট্রেন আসার সময় কিংবা অসময়ে বেশ মিল। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে রাত দশটার সেই ট্রেন এলো রাত তিনটায়। ট্রেনে চাপলাম ঠিকই কিন্তু দাদার সাথে করে রাখা প্ল্যান সব উল্টে পাল্টে গেল। ঠিক করা ছিল এইমুহুর্তে নাম মনে না পড়া কোন একটা স্টেশন অতিক্রম করার সময় দাদাকে জানাবো আর দাদা তখন স্টেশনের উদ্দেশ্যে  বের হবেন আমাকে রিসিভ করার জন্য। এদিকে আমি তো চিনিনা কিছুই। গুগল ম্যাপে লোকেশন অন করে শেয়ার করে রাখলাম। অবশেষে ট্রেন পৌঁছাল শিয়ালদা। এরই মাঝে দাদা ফোনে বললেন, ট্রেন থেকে নামার কোন প্রয়োজন নেই। ট্রেনেই থাক, নেমে কোন দিকে না কোন দিকে চলে যাবি, তুই বসে থাক তোর সিটে, আমি আসছি।

হ্যাঁ এটা সত্যি যে, শিয়ালদায় আমার এই প্রথম আসা, তারপরেও পুরো রাজস্থান আমি একা ঘুরে ফেললাম, হারালাম না, আর এখন এই শিয়ালদা স্টেশনে নাকি আমি হারিয়ে যাব। তবুও গুরুজনের হুকুম। ট্রেনেই বসে রইলাম। কিন্তু আমার ভীষন অবাক লাগছিলো এই ভেবে ‍যে, এই মানুষটা এতোটা কেয়ারিং! স্টেশনে ঢুকে আমাকে ট্রেন থেকে পিক করে নিয়ে যাবেন! এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় দাদা এসে সত্যিই সত্যিই আমাকে ট্রেন থেকেই রিসিভ করে বললেন চল্। এরপর অবাক আমি দাদার পিছু পিছু রওনা দিয়ে পৌঁছুলাম দাদার বাসায়।

বাসায় পৌঁছে জানলাম, আমাকে আনতে যাবার আগে বাজার করে বৌদির কাছে দিয়ে গেছেন আর বেচারা বৌদি এতো এতো বাজার নিয়ে তখনো হিমশিম খাচ্ছেন। বাসায় ঢুকেই বাজার গোছাতে হাত লাগালেন দাদা। বৌদি আবার আমাদের দেশী বোন, যেন কত কালের চেনা! শুরুতেই বরে দিলেন, খবরদার বৌদি বলবে না, দিদি বল।

দাদা, দিদি মিলে রান্নাবাড়া, খাওয়া দাওয়া আর আড্ডায় দারুণ সময় কাটতে লাগল। ইলিশমাছ, আম থেকে শুরু করে কত কি যে দাদা কিনে এনেছেন তার কোন হিসেব নেই! সেই সাথে যথারীতি হুকুম সব খেতে হবে! অনেক দিন পর ঘরের খাবার খেয়ে আমিও খেলাম ইচ্ছা মতো। দাদা দোতালার ঘর দেখিয়ে বললেন গিয়ে একটু রেস্ট কর, ঘুমাবিনা কিন্তু, একটু পরেই বের হব, সল্টলেক স্টেডিয়ামে যাব, টুসিরা আসবে ওখানে, প্র্যাকটিস করব।

সল্ট লেক স্টেডিয়ামে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিশাল রক ওয়াল। স্টেডিয়ামের ভেতর গিয়ে দেখা হল টুসি সহ আরও দুইজনের সাথে। সবাই খুব হাসিখুসি আর আন্তরিক। টুসি এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করেছে। শুনতে যতটা সহজ বিষয়টা তত সহজ নয় তা বোঝা গেল ওদের অনুশীলন দেখে। বিকেলটা কাটল ওদের এক্সারসাইজ আর নানান অনুশীলন দেখে। দিদি এদিক সেদিক ঘুরে এটা সেটা করে বেড়াচ্ছেন আর আমি মুগ্ধ চোখে দেখছি অন্য লেভেলের এই মাউন্টেইনারদের একাগ্র অনুশীলন। সন্ধে নাগাদ এক পশলা বৃষ্টি দিয়েই ওদের অনুশীলন পর্বের সমাপ্তি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভারের চা খেয়ে ফিরে চললাম বাসায়।

নানান গল্পগুজব করতে করতেই রাতের খাবার তৈরি। খাওয়া দাওয়া সেরে নেবার পর তিনতলায় লিভিং স্পেসে শুরু হল প্রোজেক্টরে দাদার এভেরেস্ট সামিটের ছবি দেখা। ভোর বেলা আমার ফ্লাইট, ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে অথচ, স্লাইডগুলো যে আটকে গেছে চোখে। ছবিগুলো একটা একটা করে দেখতে দেখতে মনে হল দাদার সাথে যেন আমিও ঘুরে এলাম এভারেস্টের সামিট থেকে।

পাহাড়ে অনেকেই যায়, পর্বত শিখর অনেকেই ছোঁয়, কিন্তু সেই পর্বত চূড়া হৃদয়ে ধারণ করতে পারে কয়জন ???