বিভিন্ন ধরণের অ্যাডভেঞ্চার এর মধ্যে ট্রেকিং ভীষণ জনপ্রিয়। ট্রেকিং মানেই পায়ে হাঁটা দীর্ঘ পথ আর সেই সাথে পথের ক্লান্তি। নিজের বাইরে গিয়ে নিজেকে একটু চ্যালেঞ্জ করাতেই যেন ট্রেকিং এর সবচেয়ে বড় আকর্ষন। তাই এটি আর কোন নির্দিস্ট বয়সে আটকে নেই, ছেলে বুড়ো সব বয়সীরাই ইচ্ছে বা দক্ষতা অনুযায়ী ছুটে যায় বিভিন্ন ট্রেকে। ট্রেকিং হতে পারে সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে বা ঘন জঙ্গলে বা পাহাড়ে এবং তা সাধারণত এক দিনের বেশিই হয়। নির্দিষ্ট একটা ট্রেক বা পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যান একজন ট্রেকার। তবে পথটা সমতল না হয়ে পাহাড় হলে কষ্টটা বেড়ে যায় অনেক গুণ। দীর্ঘক্ষণ হাঁটায় অতিমাত্রায় ঘাম, শরীরে পানির অভাব ইত্যাদি থেকে যে কোনো সময় মাসল পুল থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি ভর করতে পারে শরীরে। ট্রেকিং এ সতেজ থাকা বা শক্তি ধরে রাখা ভীষণ জরুরী। যেকোন অ্যাডভেঞ্চার কিংবা ট্রেকিং এ ক্লান্তি দূরে রাখার জন্য কিছু টিপস জানা থাকলে দীর্ঘ পথও পাড়ি দিতে পারবেন সহজেই কারণ পথের দূর্গমতার সাথে সাথে ক্লান্তির পেছনে আমাদের ভুলগুলোও দায়ী।

ট্রেকিং উপযোগী জুতো:
এক জোড়া ভালো জুতা ট্রেকিং এ আপনার কস্ট কমিয়ে দিবে অর্ধেক। ট্রেকিং এ যেহেতু আপনাকে কমবেশী সারাদিনই হাঁটতে হবে তাই যে জুতোটা পরে আপনি পার্টিতে যান সেটা তো ট্রেকিং এ পরা যাবেই না, এমনকি যে জুতো পরে অফিসে আসেন বা সকালে হাঁটতে বের হয়ে থাকেন সেটিও পরা যাবে না ট্রেকিং এ ।অ্যাডভেঞ্চার কিংবা ট্রেকিং এ ক্লান্তি দূরে রাখতে ভালো গ্রিপের হালকা ওজনের জুতো ব্যবহার করা উচিত। ব্রিদেবল জুতা হলে সবচেয়ে ভালো হয় তাহলে পা ঘামবেনা। দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন জুতো ব্যবহার করতে হবে। পানিতে ভিজলে ওজন বেড়ে যায় এ ধরণের কাপড়ের জুতো এড়িয়ে চলুন।

একজোড়া ভালো জুতো আপনার কষ্ট বা দুর্ভোগ কমিয়ে দিবে অনেকখানি। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে অনেকেই ১৫০ টাকা দামের প্লাস্টিকের কিছু স্যান্ডেল পরে ট্রেকিংয়ে যান যা ট্রেকে পথের ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়, সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় পিছলে পড়ে যাওয়া সহ আরো নানান দুর্ঘটনার। তবে ব্যাকআপ হিসেবে, বিপদে কাজ চালানোর জন্য হয়ত একজোড়া এই সস্তা জুতো রাখতে পারেন ব্যাগে।

পানির অপর নাম জীবন:
ট্রেকিং এ আপনি সারাক্ষণই ঘামবেন তাই শরীর থেকে বের হয়ে যাবে পানি আর এই পানির ঘাটতি মেটাতে তাই শরীরের প্রয়োজন প্রচুর পানি। সাথে পানির একটি বোতল রাখুন। একটু পর পর পানি পান করুন। কখনোই একবারে অনেক পানি পান করবেন না। তাহলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে যাবেন, আপনার বসে পড়তে ইচ্ছে করবে, বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করবে, পথের ক্লান্তি বেড়ে যাবে। অল্প পরিমাণে পানি বার বার পান করুন। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে পারলে অনেক তরতাজা বোধ করবেন। ট্রেকিং এর পথ চেনা পরিচিত হলে অর্থাৎ ঐ পথে আগেও অনেকেই গিয়ে থাকলে তাদের কাছ থেকে পানির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

 

পানি তো সাথে রাখতেই হবে এর সাথে নিতে হবে স্যালাইন বা গ্লুকোজ। সম্ভব হলে দু’টোই সাথে রাখুন। স্যালাইন অবশ্যই পানিতে মিশিয়ে খাবেন। তবে গ্লুকোজ না মিশিয়ে খেলেও কাজ করবে। মিশিয়ে খেলে বেশি কাজ করবে। ট্রেকিং এ শরীর পানির অভাব বোধ করে ভীষণ। কিন্তু শুধু পানি শরীরে শক্তি দেবে না। তাই অবশ্যই ট্রেকিং এর ব্যাগ গোছানোর সময়ই ব্যাগে স্যালাইন এবং গ্লুকোজ নিয়ে নিন।

উপযুক্ত ব্যাকপ্যাক: 
ট্রেকিং এ উপযুক্ত একটা ব্যাগ বাকী অর্ধেক পথের ক্লান্তি কমিয়ে দিবে। ব্যাকপ্যাক হলেই হবে না কারণ সব ব্যাকপ্যাকই ট্রেকিং এর জন্য উপযুক্ত নয়। অনেক ব্যাগ আছে যাতে অল্প জিনিস নিলেও ওজনে ভারি হয়ে যায় ব্যাগের ডিজাইনের কারণে। যেসব ব্যাগে বুকে এবং কোমরে বন্ধনী থাকে সেসব ব্যাগে অনেক জিনিস নিলেও শরীরের উপর চাপ কম পড়ে।

আপনার অ্যাডভেঞ্চার কে আরো আনন্দময় করে তুলতে এমন ব্যাকপ্যাকই পছন্দ করা উচিত যাতে সেই ব্যাগের ওজন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং আপনি বাড়তি কোন চাপ অনুভব না করেন। তাহলে দীর্ঘ সময় ওজন নিয়ে হাঁটলেও সেই ওজন আপনি বোধ করবেন না এবং ক্লান্ত হবেন না। ব্যাগের পিঠের অংশে শক্ত সাপোর্ট বা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকলে পিঠ ঘামবেনা এবং ওজনও টের পাওয়া যাবে না। ভালো ডিজাইনের ৫০ লিটারের  ব্যাগে ১০-১৫ কেজি ওজন বহন করা যায় অনায়াসে।

ওজন কমান:
নিশ্চয়ই মনে করার চেষ্টা করছেন আপনার ওজন কত! কিন্তু আমি আসলে বলতে চাইছিলাম ব্যাগের ওজনের কথা। তবে আপনার ওজনও যদি মাত্রা ছাড়া হয় তাহলে কমিয়ে ফেলুন ওজন যা আপনাকে যেকোন অ্যাডভেঞ্চার অ্যাকটিভিটি কিংবা ট্রেকে স্বচ্ছন্দ রাখবে।

ব্যাগের ওজন কমাতে একটা সর্ট লিস্ট করে ফেলুন এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস নেওয়া পরিহার করুন। পাহাড়ে ট্রেকিং কিংবা যেকোন অ্যাডভেঞ্চার সমতলের মানুষদের জন্য খুব কঠিন একটা কাজ। পাহাড়ি মানুষ হলে যেই পথ খুব দ্রুত পাড়ি দেবে সেই পথই অন্যদের পাড়ি দিতে যাবে অনেকটা শ্রম এবং সময়। তাই ব্যাগ গোছানোর সময় অবশ্যই শুধু দরকারি জিনিস নিন। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অযথা ব্যাগ ভারি করে নিজের কষ্ট বাড়াবেন না।

উপযুক্ত পোশাক পড়ুন:
ট্রেকিং এর পোশাক হালকা রঙের এবং ওজনে হালকা হবে। এমন পোশাক হতে হবে যাতে কাপড়ের মধ্য দিয়ে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে।

পাহাড়ে এমন অনেক জায়গা পাবেন যেগুলো এতই খাড়া যে পায়ের সাথে হাতও ব্যবহার করতে হবে উপরে উঠতে হলে তাই এমন পোশাক বেছে নিন যাতে পথ যেমনই হোক আপনার পোশাক সেখানে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। রোদ থেকে বাচঁতে সানস্ক্রিন তো অবশ্যই ব্যবহার করবেন, সাথে পোশাকটিও পরুন ফুল হাতা। রোদে হাত-পা, গলার ত্বক পুড়ে যায় যা ক্লান্তিবোধ বাড়ায়।

প্রয়োজনীয় বিরতি:
ট্রেকিং কোন প্রতিযোগিতা নয়। আপন গতিতে চলুন এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিন। প্রতি আধঘন্টার ট্রেকিং এ ২ থেকে ৫ মিনিটের ছোট্ট বিরতি নিন। প্রতি ঘন্টায় অন্তত ৭ থেকে ১০ মিনিট বিশ্রাম নিন। এর বেশী বিশ্রাম শরীর পেলে শরীর বিশ্রামই চাইবে, আলস্য ধরবে এবং সামনে এগোতে কষ্ট হবে।

খাবারের বিরতি নিন একটু বেশী সময় তারপর নতুন উদ্যমে শুরু করুন ট্রেকিং।  অনেক সময় দেখা যায়, খাবার আমরা সাথেই বহন করি কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম না করে খেতে বসি না। খাবারের অভাব শরীরকে দুর্বল করে দেয়, এতে পরের দিনের ট্রেকিং এ আরও বাড়িয়ে দেয় ক্লান্তি। তাই খাবার সময়মত খেয়ে নিতে হবে।

সানগ্লাস, সানস্ক্রিন আর ক্যাপ:
রোদ ট্রেকিং এ আপনার পরম বন্ধু, কারণ বৃষ্টির চেয়ে রোদ ভালো। আবার রোদই হয়ে দাঁড়ায় পরম শত্রু কারণ রোদ ক্লান্ত করে অনেক বেশী। তাই ব্যাগে সানগ্লাস, সানস্ক্রিন আর ক্যাপ রাখুন। ক্যাপ না থাকলে গামছা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিন। সানস্ক্রিন ঘামের কারণে ধুয়ে যায়। তাই যেখানেই পানি পাবেন হাত মুখ ধুয়ে আবার নতুন করে ক্রিম লাগিয়ে নিন।

এই সামান্য জিনিসগুলো ব্যাগ গুছানোর সময় এবং ট্রেকিং এর সময় মনে রাখলে অন্য সময়ের তুলনায় ক্লান্তি কমে যাবে অর্ধেক। পাহাড়ি পথে অনেক কষ্টকর বা ক্লান্তির তবে একে নিয়ন্ত্রণ করা বা কমিয়ে আনাও  আপনারই হাতে। ট্রেকিং এর অভিজ্ঞতা ক্লান্তিকর দুঃস্বপ্নের মতো না হয়ে হোক চিরস্মরণীয় এবং আনন্দ-উচ্ছাসের এক পরিপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চার।

 


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।