গত তিনদিন আমরা রুমা খাল ধরে হেঁটেই চলেছি। পথ ফুরোনোর কোন নাম তো নেই-ই বরং প্রতিমূহুর্তেই পথ যেন আরো ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। পিঠের উপর থাকা ভারী ব্যাগটাকে উপেক্ষা করে পথ হেঁটে যাচ্ছি। এর মাঝেই পিছন থেকে সাদেক বলে উঠলো, অপূ ভাই দাঁড়ান!!! সাদেকের কন্ঠস্বরটা কেমন জানি চাপা মনে হল!! ফিরে দাঁড়াতেই দেখি সে বেশ শুকনো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই সাদেক তার কয়েকদিনের অমানুষিক পরিশ্রমে ক্লান্ত মুখটা আরো ক্লান্ত করে যা বলল তার জন্য সে নিজেও হয়ত তৈরি ছিলনা।

আমরা ভুল করে ফেলছি অপূ ভাই। আমাদের সাথে অল্প কিছু নুডলস্ ছাড়া আর কোন খাবার মনে হয় নেই। ফেলে আসা গ্রামটার নামেই কোথাও সমস্যা আছে। মনে হয় এখানে মেন্দরুই নামে কোন গ্রামই নেই। আমি এই পথে আগে কখনও আসিনি। এবং জানিনা আগামী দুদিনেও কোন গ্রাম আমরা পাব কিনা। আমাদের খাবারের জিনিসপত্র ঐ গ্রাম থেকেই নেয়া উচিত ছিল। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিল সাদেক। আর সেই সাথে নির্বাক আমরাও!! কথা বলতেই যেন ভুলে গেছে সবাই। কি বলা যায় বা কি বলা উচিত কেউ বুঝতে পারছিনা। গুগলে আর্থ-এ দেখা মেন্দরুই পাড়াটা যে আসলে মেনতুক পাড়া তা আর আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার কোন দরকার পড়ছেনা এই মুহুর্তে। দু ঘন্টারও বেশী সময় আগে ফেলে আসা গ্রামের সাইনবোর্ডটার উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল সবারই। নিরবতা ভাঙ্গলো সাদেকই। আপনারা বসেন কোথাও, আমি ব্যাক করে ঐ গ্রাম থেকে যা পাই নিয়ে আসি। সাদেকের কথায় মনের দুঃখে মহাকালও বোধ করি হাসছিলো তখন। বেলা ১২টার কিছু বেশী। এ সময় ঐ গ্রামে ব্যাক করে যাওয়া আর ফিরে আসায় কম করে হলেও যে কোন মানুষের পাঁচ ঘন্টার মত সময় লাগবে। তার মানে পুরো দিন এখানেই শেষ।

বিশাল বিশাল সব পিচ্ছিল পাথর, ঝিরির গভীরতা, এলোমেলো জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ করে এগিয়ে যাওয়ার কারণে হাঁটার গতি ক্রমশ মন্থর হয়ে পড়ছে। এদিকে আমাদের হাতে খুব বেশী সময় যে আছে তাও নয়। সমস্ত পরিকল্পনা যদি ঠিক রাখতে হয় তাহলে যে করেই হোক আগামী দুদিনের ভিতর আমাদের রুমা খাল এর উৎসমুখে পৌঁছাতে হবেই। এর পরের পাঁচদিন আমাদের দ্বিতীয় আরেকটা অভিযানের পরিকল্পনা তো রয়েছেই। অতএব কোন ভাবেই সময় নষ্ট করা যাবেনা। যা থাকে কপালে ভেবেই খাবারের চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে আবারও হাঁটা দিলাম সবাই। কিন্তু মানুষের মন বড় জটিল। খাবার না থাকলেই হয়ত ক্ষুধাটা বেড়ে দশ হাজার গুন হয়ে যায় তাছাড়া সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি তাই একবার থেমে বিশ্রাম নেয়ার ফাঁকে সাথে থাকা অবশিষ্ট নুডলস্ গুলো থেকে যতটা না খেলেই নয় ঠিক ততটা নুডলস্ রান্না করে খাওয়ার পর মনে হচ্ছিল নাহ এ যাত্রা কোনরকম বেঁচে গেলাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে কাজ নেই।

বিশ্রামের পর আবারও শুরু পথচলা। দুপাশের বিশাল বিশাল সব পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে, বড় বড় বোল্ডারের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে হেলে দুলে বেরিয়ে আসা রুমা খাল টার প্রতিটা বাঁক যেন এক একটা রহস্যপুরী। ক্লান্তি যে কখন ভাল লাগায় পরিণত হয় এখানে তা টেরই পাওয়া যায়না। পৃথিবীটা বড় বেশী শান্ত এখানে। নাম না জানা হাজারো পাখির গান, অবিরত বয়ে যাওয়া পানির ঝিরঝির আর জঙ্গলের বিচিত্র সব শব্দের সম্মোহনে মাতাল আমরা হেঁটেই চলেছি। এই আলোছায়ায় মোহনীয় পথে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেছে তা আমাদের কারোরই জানা নেই। জানার প্রয়োজন যে খুব বেশী তাও নয়। কিন্তু বাস্তবতা মাঝে মাঝে প্রচন্ড রকমের নিষ্ঠুর হয়। বিকেল গড়িয়ে আসতেই আমাদের প্রধান লক্ষ্য একটা ক্যাম্প সাইট খুজে বের করা। যেখানে কোনরকমে রাতটা পার করা যায়। রুমা খাল এর শুরুর দিকে অনেক ক্যাম্প সাইট থাকলেও যতই উৎসের দিকে এগোচ্ছি ততই খালটা সংকীর্ন আর ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। গত দুদিনের ফেলে আসা দারুণ দারুণ ক্যাম্প সাইট গুলোকে খুব মিস করছিলাম। কোথাও কোন সমান জায়গা নেই। সেই তিনটা থেকে চারটা বেজে ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত এমন কোন জায়গা পেলাম না যেখানে আমাদের তিনটা তাবু খাটানো যাবে। এদিকে একেতো শীতকাল তার উপর পাহাড়ে সন্ধ্যা নেমে যায় অনেক তাড়াতাড়ি।

কিভাবে কি করব ভেবে কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না। হেঁটেই চলেছি উদভ্রান্তের মত। এমন সময় অনেকটা মন্দের ভালর মতই হঠাৎ একটা জায়গা পেয়ে গেলাম যেটা আক্ষরিক অর্থে ভাল না হলেও একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে কাজ চালানো যাবে। জায়গাটা বেশ খোলামেলা হলেও যত্রতত্র ছড়ানো ছিটানো পাথরে ভর্তি। আরেকটা প্রধান সমস্যা হল পাহাড়ের অবস্থানের কারনে জায়গাটায় বাতাসের গতিও বেশ তীব্র। তারিক ওবায়দা ভাইয়ের দেয়া থার্মোমিটারে যেখানে এই বিকেলবেলার তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস দেখাচ্ছে সেখানে রাতের বেলা এই ধারালো ছুরির মত বাতাসকে কিভাবে সামলাবো তা আমাদের কারো মাথায় না আসলেও এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যাওয়াটা বোকামী। অতএব কি আর করা লেগে গেলাম কাজে। নিচের সমস্ত এবড়ো থেবড়ো পাথর সরিয়ে। অল্প কিছু দুর থেকে মাটি কেটে এনে তার উপর কলা পাতা বিছিয়ে যখন আমাদের ক্যাম্পসাইট তৈরি তখন দিনের আলোর ছিটে ফোঁটাও নেই কোথাও।

এরপর সবচেয়ে কঠিন কাজের পালা আর তা হল যতটা সম্ভব টর্চের ব্যাটারী বাঁচিয়ে এই অন্ধকার হাতড়ে লাকড়ি খুজে বের করে এনে আগুন জ্বালানো। কুয়াশা ভেজা জঙ্গল, কোথাও আপাত শুকনো কিছু নেই বললেই চলে তারপরও এই ঠান্ডায় সুস্থ থাকার একমাত্র উপায় আগুন! তাছাড়া আলোর ব্যাপারটা তো আছেই। অবশেষে ভয়ংকর এক অগ্নিপরীক্ষার শেষে যেন পুরো জঙ্গলকে আলোয় আলোকিত করে জ্বলে উঠলো আগুন। ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত-পা গুলো আর কোন কাজ করতে না চাইলেও উপায় নেই। প্রচন্ড পরিশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত শরীরটার এই মূহুর্তে সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন সেটা হলো খাবার। আর তাই শরীরটাকে কোনরকম গরম করেই লেগে পড়লাম আমাদের সাথে ঠিক কতটা খাবার আছে তা জানার কাজে।

ব্যাগ-ট্যাগ হাতড়ে যা পেলাম তা মোটামুটি ২৫০ গ্রামেরও কম চাল, ছোট দুই প্যাকেট নুডলস্, এক প্যাক সয়া নাগেট (যেটা রান্নার জন্য আর কোন উপকরণ নেই), অল্প খৈ, দুইটা Munch চকোলেট আর কলাপাতা কাটতে গিয়ে পাওয়া একটা কলার মোচা(ফুল) এটুকুতেই সীমাবদ্ধ। জড়ো করে রাখা নিতান্তই অল্প এই খাবারগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা আমাদের এই সাত জন চরম ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে তাকিয়ে উপহাসের হাসি হাসছে। আমাদের সাথে থাকা পাহাড়ি দাদুর জন্য ভাতগুলো রান্না করা হবে আর বাকী যা কিছু আছে তা দিয়ে আমরা কোনরকম খেয়ে নিব এরকম সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও খাওয়ার সময় দারুণ সরল আর মমতায় ভরা বুড়ো মানুষটা আমাদের জন্য একপ্রকার জোর করেই কিছু ভাত রেখে দিল। সিদ্ধ করা কলার মোচা দিয়ে ঐ যৎসামান্য ভাতগুলো একটা প্লেটে মেখে অরণী যখন এক এক করে আমরা ছয় ছয়টা ভয়ানক ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে তুলে দিচ্ছিল তখন আবার আরেকবার সবাই উপলব্ধি করছিলাম জঙ্গলের বন্ধুর চেয়ে পৃথিবীতে আপন কিছুই হয়না। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো অরণীকে একবার মা বলে ডাকি। কিন্তু বেচারা লজ্জায় পড়ে যাবে ভেবে ডাকা হয়ে উঠেনি।

তাপমাত্রা খুব দ্রুত নামছে! মাঝে মাঝে আমরা মজা করছিলাম এই বলে যে আমরা কি হিমালয়ের কোথাও আছি নাকি!!! সবসময় টিভি তে বলা শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রাকে কাঁচ কলা দেখিয়ে সাত ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর পাহাড়ের খাঁজে অশুভ ছায়ার মত কনকনে ঠান্ডা বাতাসের দাপটে আমাদের সবারই খুব খারাপ অবস্থা। তাবুর ভিতরে গিয়ে শোয়া তো দূরের কথা আগুনের পাশ থেকে নড়তেই যেন পারছিনা। এদিকে খাওয়াটাও তেমন ভাল হয়নি। হঠাৎ সাদেক আর রুহী ভাই প্লান নিল খাল থেকে কিছু মাছ ধরতে পারলে খারাপ হয়না। তাহলে অন্তত খাওয়ার কিছু পাওয়া যাবে। পাহাড়ের পথে আমার ব্যাগের ভেতর সবসময় জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাট পর্যন্ত সব জিনিসই থাকে সেখান থেকে জুতো সেলাইয়ের সুঁইটা দিয়ে অনায়াসে একটা মারাত্মক তীর বানিয়ে ফেলা যায় আর বাঁশ কেটে ধনুক বানানো তো নিতান্তই সময়ের বিষয়। কিন্তু আমার তেমন ইচ্ছে হচ্ছিলনা এই কনকনে ঠান্ডায় তীর ধনুক নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার। কিন্তু ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী মাঝে মাঝে গদ্যময়ই শুধু না তারও বেশী কিছু হয়ে পড়ে..!!! অতএব, তিলোভা আর ইতি আপুর হাতে আগুনটা জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব দিয়ে, তীর ধনুক বানিয়ে আমরা তিন জন নেমে গেলাম বরফ শীতল রুমা খালে। শিকার অভিযান যে একেবারেই খারাপ হয়নি এবং আমাদের তৈরি তীর ধনুক যে খুব ভালই সফল তা বুঝলাম যখন দেখলাম বেশ কিছু চিংড়ি আর একটা কাকড়া আমাদের খাবারের তালিকায় যোগ হল। মিশন শেষে বেশ ভাবের সাথে ক্যাম্প সাইটে যখন ফিরলাম তখন সবার আনন্দ যেন আর ধরেনা। যাই হোক, যেহেতু আমাদের সাথে রান্নার জন্য কোন আনুসঙ্গিক উপকরণ নাই অগত্যা কি আর করা কোনরকম আগুনে ঝলসেই মাছগুলোকে পেটে চালান করে দিলাম। আমিষ হোক কিংবা শিকারের আনন্দ, উত্তেজনা যাই হোকনা কেন মনে হচ্ছিল অনেক খেলাম।

সে রাতে কারোরই ঘুম হয়নি। তাপমাত্রা মাঝরাতের পর কাঁটায় কাঁটায় ছয় এর ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের স্লিপিং ব্যাগগুলো তাদের সর্বশক্তি দিয়ে খেটেও আমাদেরকে উষ্ণ রাখতে পারছিলোনা। বাইরে বৃষ্টির মত কুয়াশা, আগুনের পাশে যে বসে থাকব সেই উপায়ও নেই। সবাই শ্রেফ অপেক্ষা করছিলাম কখন ভোর হবে। কিংবা আদৌ কি কোনদিন ভোর হবে..!!! অতঃপর প্রচন্ড শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রনা সহ্য করার পর, যেন শত-সহস্র বছর পেরিয়ে দাম্ভিক দানবের মত দাড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূঁড়াগুলো আলোয় আলোকিত করে দিয়ে এল কাঙ্খিত ভোর। কোন খাবার নেই তাই খাওয়ার কোন ঝামেলাও নেই। আগুনের পাশে শরীরটা একটু গরম করে নিয়েই সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। আবারও সেই হীমশীতল পানি ধরে হাঁটা। কিন্তু উপায় নেই। আজকে যে করেই হোক কোন একটা গ্রামে পৌঁছুতেই হবে।

এরপর শুধুই পথ চলা। ক্ষুধা আর ঠান্ডায় ক্লান্ত অসার পা চলতে চাইছেনা। অথচ না হেঁটে এবং পানিতে না নেমে উপায় নেই। তারসাথে উপরি হিসেবে কিছুক্ষণ পর পর কুমগুলো তো রয়েছেই। কোনটায় কোমর সমান পানি, কোনটার পাশের খাঁড়াইতে কোন রকমে হাত পা রেখে এগিয়ে যাওয়া এভাবেই এগিয়ে চলছি পুরো দল। ক্ষুধার যন্ত্রণায় তারা আলু নামের একটা গাছের শিকড় আর কোনভাবে জঙ্গলে বেড়ে উঠা চোকরের ফল খেয়ে, বারবার ছোট বড় অসংখ্য সব পাথুড়ে ক্যাসকেইড আর ঝর্ণা পেরিয়ে আমরা যখন জিংসিয়াম সাইতার ঝর্ণায় পৌঁছুলাম তখন প্রায় বিকেল। শীতের দিনের প্রায় শুকনো জিংসিয়াম সাইতার দেখায় যদিও তেমন কোন আনন্দ নেই তারপরও আমাদের খুশী দেখে কে..!! কারণ জিংসিয়াম সাইতার মানেই কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রুমানা পাড়ায় পৌঁছাব।

কিছু সময় জিংসিয়ামের সাথে কাটিয়ে যখন আমরা রুমানা পাড়ায় তখন সন্ধ্যা। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আমরা রুমানা পাড়া পৌঁছালে লিয়াং-এর ঘরে উঠবো। প্রচন্ড আলাপি আর হাসিখুশী মানুষ লিয়াং আর তার পরিবারের সবার সাথে আড্ডা দিয়ে, খাওয়া দাওয়া সেরে কখন যে আমরা প্রচন্ড ক্লান্ত, শ্রান্ত মানুষগুলো ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ঘর থেকে বেরুনোর পর এটাই ছিল প্রথম রাত যেদিন আমরা বেশ আয়েশি ছিলাম। খাওয়া দাওয়ার কথা বলছিনা কারণ সবাই ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন আমরা খাবার পেলে কি কি করতে পারি। তবে সেদিনের ঘুমটা ছিল অসাধারণ। গরম গরম নকশী কাঁথা আর স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে বলা যায় মরার মত ঘুমিয়ে যখন ভোর পাঁচটায় উঠেছি তখন শরীরের কোথাও যেন ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও নেই। বাকীদের সবাইকে ঘুমুতে দিয়ে আমি, রুহী ভাই আর সাদেক গেলাম জিংসিয়াম সাইতারের বাকী ধাপগুলো জিপিএস-এ মার্ক করে আনতে। ফিরে এসে দেখি সবাই একপ্রকার তৈরী বেরুনোর জন্য। তাড়াহুড়ো করে খাওয়াটা শেষ করেই আবার বেরিয়ে পড়লাম সবাই।

মাত্র ৪৫ মিনিট ট্রেক করেই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্খিত সেই জায়গায় যেখানে সলোভা আর পানকিয়াং নামের দুইটা ঝিরি এসে এক অবাক ভালবাসায় পরস্পরকে পরস্পরের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে জন্ম দিয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর রুমা খাল -এর। জায়গাটা এতটাই নিরীহ আর শান্ত দেখতে যে, সেখানে দাঁড়িয়ে মনেই হবেনা এই রুমা খাল -টাই প্রচন্ড দাপটের সাথে রুমানা পাড়া ঝর্ণা, জিংসিয়াম সাইতারের মত দানবীয় তিন তিনটা ধাপের বিশাল ঝর্ণা, অসংখ্য ছোট বড় ক্যাসকেইড আর পাথুরে ঝিরির চোখ রাঙ্গানীকে উপেক্ষা করে দস্যি একটা পাহাড়ি মেয়ের মত এক দৌড়ে গিয়ে মিশে গেছে ভালোবাসার সাঙ্গুতে। বারবার আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো গত চারদিনের ফেলে আসা পথ। পথচলার ক্লান্তিতে বারবার গালাগালি করা রুমা খাল-টার জন্য মনটা এতটাই কাতর হয়ে পড়ছিল যে, ইচ্ছে করছিল আবার আরেকবার হেঁটে যাই সেই ভয়ংকর সুন্দর রুমা খালে। আবারও তীর ধনুক নিয়ে গা শিউরে উঠা পানিতে চিংড়ি শিকারে নেমে পড়ি দুরন্ত কোন কিশোরের মত। আবার তাবুর ভিতর কাঁপতে কাঁপতে পার করে দেই অনেকগুলো নির্ঘুম রাত। কিন্তু বাস্তবতার অবস্থান সব সময়ই আমাদের মনের বিপরীতে। আমাদের সামনে এখনও অনেক পথ। রাইখ্যিয়াং খালের উৎসমুখটা এখনও আমাদের অজানা। আর তাই রুমা খাল -টাকে নিষ্ঠুরের মত পিছনে ফেলে আবারো পথে নেমে আসলাম যে পথের দিগন্তটা কোন এক অজানা পাহাড়ে, যেখানে জন্ম নিয়েছে রাইখ্যিয়াং নামের আরেক অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়ি নদী।

সেই গল্পটা আরেকদিনের জন্য রেখে দিয়ে আমরা এখন একটু পিছনের কথায় আসি। সময়টা ২০০৩-এর ফেব্রুয়ারি, প্রথম কেওক্রাডং অভিযান। তখনও কেওক্রাডং বা বগালেক যাওয়ার রাস্তাটা তৈরি হয়নি। সিয়াম ফুপুর বাবা বাড়ি ফিরবেন অতএব, আমরা তাঁর সাথে যেতেই পারি! রুমা বাজার থেকে লাইরান পি পাহাড় ডিঙ্গিয়ে রুমা খাল এ নেমে আমরা শ্রেফ অবাক তাকিয়ে আছি। সম্মোহিতের মত  অসাধারণ সুন্দর ঝিরিপথ, বিশাল বিশাল সব পাথর, ঘন বন, দুপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দানবের মত বড় বড় পাহাড় বারবার পারাপার করা গুনে গুনে পথ চলতে চলতে বগামুখ নামে এক জায়গায় এসে আমাদের হঠাৎ করেই নিষ্ঠুরের মত রুমা খাল ছেড়ে দিয়ে অন্য একটা ঝিরি (পাতাং ঝিরি) ধরতে হল। ভীষন আফসোস, রাগ বা অভিমানে মনটা খারাপ হয়নি বলা যাবেনা কিন্তু পথের স্বার্থেই ব্যাপারটা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। তার উপর বাড়তি পাওনা হিসেবে প্রথমবারের মত বান্দরবান অভিযানের ভীতি তো আছেই। কিন্তু ঝিরির লোভ আমি কোনদিনই সামলাতে পারিনা আর তাই সুতোকাটা ঘুড়ির মত একটা ইচ্ছেও তখন থেকেই মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো যে করেই হোক একদিন এই রুমা খাল টা পুরোটা হাঁটতে হবেই। এরপর অনেকবার বান্দরবান গেছি, এমনকি রুমা খালের ঐ অংশ পর্যন্ত আরো কয়েকবার হেঁটেছি। কিন্তু ইচ্ছেটা সেই, ইচ্ছেই রয়ে যাচ্ছিল! গুগল আর্থে রুমা খালের উপর চোখ বুলানো ছাড়া আর কোনভাবেই রুমা খালে ধরে হেঁটে যাওয়া হয়ে উঠছিলনা।

সেই ইচ্ছে কিংবা স্বপ্ন পূরণের সংকল্প থেকেই করা এই অভিযান।


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।