হারিয়ে যাচ্ছে বালি ! না, ইন্দোনেশিয়ার সাজানো গোছানো বালির সমুদ্রতটের কথা বলছি না। পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে থাকা সহস্র সমুদ্র তট, মরুভুমি, নদী, সমুদ্রগর্ভে ছড়িয়ে থাকা বালির এই বিরাট বিপুল ভান্ডারের কথা বলছি। দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া সমুদ্র সৈকত, অবারিত মরুভূমি, নদীর বুকে জেগে থাকা চর দেখলে আমাদের এমন ভাবনা হতেই পারে যে, এই বালিরাশির কোন শেষ নেই। এ বুঝি অনন্ত, অফুরন্ত কোন স্রোতে ভেসে আসা। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এই ভাবনার ঘোড়ার লাগামটা টেনে ধরতে হয় সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে।

পৃথিবীতে পানি এবং বাতাসের পর আমরা সবচেয়ে বেশী নির্ভরশীল যে জিনিসটার উপর তা সম্ভবত বালি। আপনার চারপাশে সুরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা, আপনার জানালার কাঁচ কিংবা নিত্য ব্যবহার্য আয়না, আপনার হেঁটে বেড়ানো রাস্তাঘাট, আপনার ব্যবহার করা ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি এমনকি টুথপেস্ট, সানস্ক্রীন ইত্যাদি ইত্যাদি নানাবিধ জিনিস তৈরিতে প্রধান উপকরন হিসেবে বালির প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী।

United Nations Environment Program (UNEP)-র মতে বর্তমানে প্রতি বছর শুধু নির্মাণ কাজেই ৪৭ থেকে ৫৯ বিলিয়ন টন বালি এবং নুড়ির ব্যবহার করা হয় যা পূর্ববর্তি সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। আর বালির এই আকাশ ছোঁয়া চাহিদার কারণে প্রতিদিন একটু একটু করে হুমকির মুখে পড়ছে বালির এই বিশাল সঞ্চয়। বিশেষজ্ঞদের মতে বালির এই বিপুল চাহিদা মেটাতে গিয়ে একদিন আমরা নিশ্চিত ভাবেই হারিয়ে ফেলবো অনেক কিছুই। বালিতে ঢাকা সমুদ্রতট, মরুভূমি, দ্বীপ ইত্যাদি হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদী কিংবা মহাসাগরীয় দূষণ তো রয়েছেই। শুধু তাই নয়, বালির এই সর্বগ্রাসী চাহিদার সুযোগে কালো বাজারের নৃশংসতার কথাও একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষক মহল।

আবারও প্রশ্ন আসতে পারে বালির এই তথাকথিত অফুরন্ত ভান্ডার কি আর এত সহজে শেষ হবে! এই প্রশ্নের উত্তরটাও খুব সহজ, না এত সহজে শেষ হবেনা কিংবা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা হয়ত তেমন নেই। কিন্তু তাই ভেবে আয়েশে গা এলিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই কারণ একটু কান পাতলেই বালির এই হারিয়ে যাওয়া কিংবা ঘাটতি এবং তার বিপরীতে ঘটতে থাকা বিপদের অশনি সংকেত শুনতে পাওয়া যাবে অনায়াসে। শুধুমাত্র অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলনের কারণে, কেনিয়াতে প্রবাল প্রাচীরের বিপুল ক্ষতিসাধন, ভারতে কুমিরের বিলুপ্ত হয়ে পড়ার আশংকা, ইন্দোনেশিয়ায় প্রচুর ছোট ছোট দ্বীপ হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানান সমস্যা যে কোন এক অশুভ কিছুর ইঙ্গিত তা আজ খুবই স্পষ্ট। আর এই অশুভ কালো ছাঁয়া থেকে মুক্তি পেতে বালির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং যথোপযুক্ত বিকল্প খুঁজে বের করাই একমাত্র উপায়।

বালির এই হারিয়ে যাওয়া নিয়ে আরো জানতে পড়ুন A looming tragedy of the sand commons


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।