অক্সিজেন ক্যান ফুরিয়ে আসছিলো, ইদানিং একটা ক্যানে ২ সপ্তাহর বেশী চলেই না, তাই ভাবছিলাম পাহাড়- জঙ্গলে যেয়ে ক্যানটা রিফিল করে আসা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের মীরেরসরাইতে বন্ধুর পোস্টিং আছে। বন্ধুর বউ কামরুন নাহার ভাবী কয়েকবার বলছিল আবার আসেন, আগেরবার কিছু খাওয়াইতেও পারি নাই, ঘুরতেও পারি নাই। তাই অক্সিজেন ক্যান রিফিল করা আর ভাবীর হাতের মজার মজার খাবারের জন্য আবারো ট্যুর প্ল্যান করলাম মীরেরসরাইতেই।

আমাদের সাথে ছিল এক নবদম্পতি, আমার অনেক ক্যাম্পিং এর একমাত্র সঙ্গী আসিফ (একজন অঘটনঘটন পটিয়সী) ও জান্নাত ভাবী, বন্ধু তানজীর ও কামরুন ভাবী আর অবনী সোনা! অবনীর মাত্র দেড় বছর বয়স কিন্তু কোন কিছুতেই ভয় নেই, হয়তো এই অনুভূতিটাই এখনো তৈরি হয়নি, সে পাহাড় আর লেক সমানে দাপিয়ে বেড়িয়েছে দুদিন!

এবারের ট্যুরের আরেকটা বিশেষ ব্যপার ছিল নিজের একটা আবিষ্কার রিয়েল সিচুয়েশনে টেস্ট করে দেখা। ক্যাম্পিং করতে গিয়ে প্রায়ই একটা সমস্যায় পড়তাম, সেটা হল রান্না করতে গিয়ে চুলার সমস্যা, বিশেষ করে বীচ বা চরে বেশী কষ্ট হতো। কুয়াকাটা লেবুর চরে ক্যাম্পিং এ রান্না করতে গিয়ে রীতিমতো হাপিয়ে গিয়েছিলাম! সেবার ঘরে ফিরেই ভাবতে থাকি নিজেই কিছু বানাবো, অল্প খরচে, ওজন কম, জায়গা নিবে কম, টিকবে অনেকদিন, ব্যবহার করা যাবে অনেকবার এমন কিছু। ইন্টারনেটে খুঁজে হাজারো ডিজাইন পাই, কিন্তু মন মত হয়না। আমি সিম্পলিসিটি পছন্দ করি, হালকা কিন্তু ডাইনামিক কিছু চাই। আমার ঘরটাকে এক ওয়ার্কশপ বানিয়ে চুলার বেশ কয়েকটা ডিজাইন আর প্রোটোটাইপ বানিয়ে ফেললাম ২ সপ্তাহে। একদিন গভীর রাতে হঠাৎই বানিয়ে ফেলি দারুণ একটা ক্যাম্পিং-স্টোভ! রুমের মধ্যে তখনই চা বসিয়ে দেই, দারুণ কাজ করে! তারপর থেকে অপেক্ষায় ছিলাম পাহাড় গিয়ে টেস্ট করবো, তাই এই ক্যাম্পিং এর আয়োজন করা। এই পাহাড়ের বুকেও অসাধারণ সার্ভিস দিলো, ইচ্ছে করছিলো সারাদিন রান্নাই করি!

Living with Forest থেকে অপূ ভাই আর জিনি আপু আমাদের জন্য একটা 3IN1-2PERSON হ্যামক বানিয়ে দিয়েছেন সেটাও টেস্ট করলাম- বেশ ভালো হ্যামকটা। এরকম একটা মাল্টি-পারপাস হ্যামকই খুঁজতেছিলাম। এটা শুধুই হ্যামক নয়, একই সাথে এটা একটা টার্প যা দিয়ে সহজেই একটা বৃষ্টি-রোধক শেল্টার বানানো সম্ভব আবার নিতান্তই বসার চাদর হিসেবেও দিব্যি ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া, ওয়াটার রেপেলেন্ট ফেব্রিক হওয়ায়, বর্ষায় খুব সহজেই বৃষ্টির পানি ধরে পানীয় জল সংগ্রহ করা সম্ভব- যে পানিটা আবার ডিজ-ইনফেক্ট করারও কোন প্রয়োজন নেই!

সকালে নাস্তা সেরেই সবাই বেরিয়ে পড়লাম, মীরেরসরাই বাজার থেকে হাইওয়ে ধরে প্রায় ১৫ কিমি দক্ষিণে চলে এলাম, গাড়ির রাস্তা শেষে নেমে পড়লাম, এবার হাঁটা শুরু। শীতের মৌসুম তাই ঝিরিতে অল্প পানি, পাশেই পাহাড়ের ঢালে বিভিন্ন সবজির ক্ষেত। আঁকাবাঁকা ঝিরিপথ ধরে এগোতে থাকি, সবার সামনে অবনী তার বাবার কাঁধে চড়ে যাচ্ছে আর যাই দেখছে বলছে “কি!? কি???” মিনিট ত্রিশেক হেঁটে আমরা চলে এলাম বড় কমলদহ ঝর্ণা যা রুপসী ঝর্ণা নামেও পরিচিত। শীতের মৌসুম বলে তেমন পানি ছিলোনা। একেবারেই নিরব নির্জন জায়গাটা। সবাই মিলে উঠে পড়লাম ঝর্ণার উপরের অংশে। বেশ সুন্দর আর প্রশস্থ জায়গা। গাছের ছায়ায় হ্যামকটা বিছিয়ে অবনীকে বসিয়ে দিলাম, সে কি আর বসে থাকে, ভীষণ ব্যস্ততা তার, সব কাজ করতে হবে!

আমার আর তর সইছিল না। খড়ি আর শুকনো ডাল যোগাড় করে আমার বানানো স্টোভে আগুন জ্বালিয়ে দিলাম। ঝর্ণা থেকে পানি নিয়ে রান্না চড়িয়ে দিলাম। স্টোভটা নিয়ে তখন আমার এক্সাইটমেন্ট চূড়ায়, ভয়ও হচ্ছিল ঠিকমতো কাজ করবে কিনা। এতো ভালো পারফরমেন্স দিল! আমি ওভার-স্যাটিসফাইড! আমার চেয়ে রুমি দেখলাম বেশী এক্সাইটেড, সে একের পর এক টেস্ট চালিয়ে যাচ্ছে! ক্যাম্পিং এ ওর আগ্রহ দেখলে বেশ শান্তি লাগে। সারাদিন আমরা কয়েকবার চা আর স্যুপ বানিয়ে খেলাম। রাতে বারবিকিউ করলাম মুরগি, আর ফয়েলে মাছ, এই মাছ আবার কামরুন ভাবী ধরেছেন ছিপ দিয়ে, ব্যাপারটাই অন্যরকম।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে চলে এলাম মহামায়া লেকে, এখানে লেকের গহীনে কায়াকিং করাটা অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা ছিল! এবারই প্রথম অবনীও এলো কায়াকে, মায়ের কোলে বসে তার বিস্ময়ের শেষ নেই! দ্বীপমতো একটা জায়গায় কায়াকগুলো বেঁধে নামলাম আমরা। জলের ধারে পাহাড়ের ঢালে হ্যামকটা টানিয়ে দিলাম, মৃদু বাতাসে দোল খেতে খেতে চা নাশতা আর আড্ডা চলতে থাকলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলে আরো ভীষণ মায়াবী হয়ে উঠলো যেন…

এই আয়না জল, অচিন পাখির ডাক, শুকনো পাতা, হিম-বাতাস, নৌকো, সাদা বক, কালো পানকৌড়ির কাছ থেকে অক্সিজেনের ক্যানটা রিফিল করে আবারো ফিরে এলাম শহুরে জীবনে।