পরিকল্পনা ছিল লোকালয়ে ফিরেই বুথ থেকে টাকা তুলব তাই ঘরে ফেরা র আগে সাথে থাকা প্রায় সব টাকা ট্রিপে খরচ করে ফেললাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এবার এসি গাড়িতে চড়ে ফিরব রাস্তার জ্যামটা সহনীয় করার জন্য আর অফিসে ঢোকার আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাবার জন্য। কিন্তু আশে পাশে কোন বুথ খুঁজে পেলাম না টাকা তোলার জন্য। নন এসি বাসের টিকেট কেনার পর সাথে অবশিস্ট ছিল ৬০ টাকা। এই টাকাতেই ঘর পর্যন্ত ফিরতে হবে।

আমার ঘর গাজীপুরে। বাস নামাবে আবদুল্লাহপুরে। আবদুল্লাহপুর থেকে চৌরাস্তার বাস ২৫ টাকা, সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত লেগুনাতে ভাড়া ১০ টাকা, আর গেট থেকে আমার ঘর পর্যন্ত রিকশায় ১৫ টাকা, মোট ৫০ টাকা। কাজেই দেখা গেল এক বোতল পানি যার দাম অন্তত ১৫ টাকা সেটা কিনে খাবার মত টাকাও নেই আমার কাছে। 

যাত্রাপথে আমি সাধারণত কিছু খাইনা কিন্তু টাকা না থাকলে যা হয় আর কি! এদিন চোখে পড়তে লাগল সারা রাস্তা জুড়ে নানান ধরণের ফেরিওয়ালা আর তাদের বিক্রি করা বিভিন্ন জিনিস খাওয়ার জন্য আমার মন আনচান করতে লাগল। কখনো বাদাম ভাজা, কখনো ঝালমুড়ি, কখনো মালাই আইসক্রিম, কখনো পেয়ারা মাখার মত লোভনীয় খাবারগুলো জিভে জল আনতে সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। নিজের মনে বিভোর থেকে এসব লোভ সামলে চুপ চাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন পৌঁছাব গন্তব্যে।

সন্ধ্যার মধ্যেই পৌঁছানোর কথা কিন্তু রাস্তায় ভীষণ জ্যামের কারণে দেরী হতে লাগল। রাত দশটায় আবদুল্লাহপুর নেমে দেখি রাস্তায় লাখ লাখ লোক। সবাই চৌরাস্তার বাস ধরবে। আমার পিঠে প্রায় ১৫-১৮ কেজি ওজনের ব্যাকপ্যাক, সামনে ৭-৮ কেজি ওজনের একটা ছোট ব্যাকপ্যাক আর হাতে একটা ঝোলা… সেটাতে স্লিপিং ব্যাগ আর দুই জোড়া জুতা। ট্রেকিং এর কাপড় পরা, সামনে-পিছনে ব্যাগ আর হাতে ঝোলা সমেত আমাকে নিশ্চয়ই ভীনগ্রহের প্রাণীর মত দেখাচ্ছিল ঢাকার রাস্তায়। রাস্তার লোকের দৃস্টি উপেক্ষা করে বাস খুঁজতে লাগলাম। কোনো বাসে সিট ফাঁকা নেই, সত্যি সত্যি গেটলক করে যাচ্ছিল। এত এত লোকের ভীড়ে আমি এত কিছু নিয়ে লোকাল বাসে ওঠার চিন্তাও করতে পারছিলাম না। এক শুভাকাঙ্খী বলেছিল হাউজ বিল্ডিং এ নেমে VIP বাসের টিকেট কাটতে। আমি তার কথা না শুনে আবদুল্লাহপুর নামার ফলটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম।

ঘরে ফেরা র তাগাদা অগত্যা কি আর করা সেই এলিয়েন লুক নিয়েই হাঁটতে থাকলাম হাউজ বিল্ডিং এর দিকে। পথে বুথ পেয়ে সেখান থেকে টাকা তুললাম কিছু। তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। বুথ থেকে বের হবার পরেই মনে হল চারটে লোক আমাকে অনুসরণ করছে। হয়তো কিছুই না কিন্তু ওই অবস্থায় মনের বাঘেই খাচ্ছিল আমাকে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই এতো রাতে বুথ থেকে বের হওয়া আমার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া ৪টা মানুষের জন্য কিছুই না। রাস্তায় যদিও অনেক লোক ছিল কিন্তু তাতে ভরসা পাবার কিছুই নেই কারণ এই ধরণের পরিস্থিতিতে ভীতু জনতা চেয়ে চেয়ে তামাশা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। 

উর্ধশ্বাসে হেঁটে আমি এড়াতে চাইলাম লোকগুলোকে… এর মধ্যেই চলে আসল প্রায় ফাঁকা একটা রাস্তা যা দেখে আমি তখন রীতিমত আতঙ্কিত। কি করবো, কোন দিকে যাব বুঝতে না পেরে আমি যখন দিশেহারা তখন দেখি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লেখা একটা বাস। আমি তখনো বুঝতে পারছিলাম না আমি সত্যি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দেখছি নাকি আমার আতঙ্কিত মন সুবিধামত কল্পনা করে নিচ্ছে। কারণ ওই সময়ে ওই বাস ওখানে থাকার কথা নয়, রাত নয়টার মধ্যেই এই বাস এই এলাকা পার হয়ে যায় আর তখন বাজছিল রাত ১১ টা। কল্পনা আর বাস্তবের দারুণ এক দ্বিধার দোলায় যখন দুলছি তখন সম্বিত ফিরলো “ম্যাডাম! কই যাবেন? “ ডাক শুনে। বাসের দরজায় দাঁড়ানো ভীষণ পরিচিত মুখটা দেখেই বুঝে গেলাম আমার আর ভয় নেই। বাসে উঠে ব্যাগগুলো রেখে পা ছড়িয়ে বসার পর মনে হল নাহ নিরাপদেই ঘরে ফেরা হবে তা সে যত রাতই হোক। সেই রাতে আরো কিছুক্ষণ জ্যাম সহ্য করে যখন ঘরে ফিরলাম তখনো আমার কাছে ঘরে ফেরা বাবদ বরাদ্দ ৫০ টাকা ব্যাগেই রয়ে গেছে। 


পুনশ্চ: ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। অপচনশীল যেকোন আবর্জনা যেমন পলিব্যাগ, বিভিন্ন রকম প্লাস্টিক প্যাকেট, যে কোন প্লাস্টিক এবং ধাতব দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের সাথে নিয়ে এসে উপযুক্তভাবে ধ্বংস করুন। এই পৃথিবীটা আমাদের অতএব, এটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।